বিজয়ের ৫০ বছর : বৈষম্য অবসান কবে হবে?-বিভুরঞ্জন সরকার

0
155
এফআইআর টিভি অনলাইন ডেস্কঃ ডিসেম্বর মাস এলেই দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে ‘বিজয়ের মাস’ বলে একটি কলাম চালু করা হয়। কারণ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির ওপর হামলে পড়লে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ডিসেম্বর মাস তাই আমাদের বিজয়ের মাস। এবার বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপন করছি আমরা। ৫০ বছর একটি জাতির জীবনে খুব বেশি সময় নয়, আবার  একেবারে কম সময়ও নয়। বিজয়ের মাসে সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের  অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। সরকারি উদ্যোগে বা পৃষ্ঠপোষকতায় না হওয়া অনুষ্ঠানগুলোতে সাধারণত স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি থাকে।
দিন কয়েক আগে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে একজন মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরের যুদ্ধদিনের কথা বলতে গিয়ে দেশের বর্তমান অবস্থার কথাও বাদ দিলেন না। কিছুটা হতাশার সুরে বললেন, এখন দেশে যা চলছে, যেভাবে নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ছে, দুর্নীতি বাড়ছে, গণতন্ত্র যে সংকটমুক্ত হতে পারছে না – এসব দেখে নিজেকেই প্রশ্ন করি এমন দেশই কি আমরা একাত্তরে হাতিয়ার তুলে নেওয়ার সময় চেয়েছিলাম?  ভদ্রলোক আরো অনেক কথা বললেন, সেসব এখানে উল্লেখের প্রয়োজন নেই।

এবার বিজয়ের মাসে এসে আমার মনের মধ্যেও কিছু বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বাধীনতা যেকোনো জাতির জন্য গৌরবের, অহংকারের। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ৫০ বছর পর দেখা যাচ্ছে আমাদের কারো কারো মধ্যে স্বাধীনতা নিয়ে উচ্ছ্বাস নেই, কারো মধ্যে বা কিছুটা বিরূপতাও তৈরি হয়েছে । আমার ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে একজন লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা খুঁজে পাই না। বাংলাদেশ এখন উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ হেফাজতে ইসলামসহ কিছু ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে দেশকে এতটাই পিছিয়ে নিয়েছে যে, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকলেও নাকি এতটা পশ্চাৎধাবন হতো না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য পছন্দ করি না। আমাদের দেশের বাম রাজনীতিচর্চাকারীদের একটি প্রবণতা হলো, যাকে দেখতে নারী তার বিরুদ্ধে একটি তাত্ত্বিক যুক্তি দাঁড় করিয়ে তার ভুল বা সীমাবদ্ধতাগুলো বড় করে তুলে ধরে সাফল্যগুলো আড়াল করা বা ধর্তব্যের মধ্যে না নেওয়া। আমি নিজে এই ধারা থেকে এসেছি বলে জানি, তত্ত্ব দিয়ে, যুক্তি দিয়ে এরা সব সময় নিজেদের অবস্থানকে অভ্রান্ত প্রমাণে সক্ষম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তাদের অবস্থান ছিল ভুল। জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা তার সবই ভুল নয়। আবার জীবন শুধু নির্ভুলও হতে পারে না।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অনেক সাফল্য আছে। অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে আর দুর্যোগ-দুর্বিপাকের দেশ হিসেবে পরিচিত নয়। বাংলাদেশ এখন ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিশ্বমোড়লদের কাছে ছোটাছুটি করে না। সামাজিক ও মানব উন্নয়নের অনেক সূচকে বাংলাদেশ এখন অনেক সমৃদ্ধ দেশকেও টেক্কা দেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে পারছে। নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনসহ অনেকেই বাংলাদেশের অগ্রগতির, সাফল্যের মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশ এখন আর না-খেতে পাওয়া মানুষের দেশ নয়। দুর্বল অর্থনীতির দেশও নয়। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো মেগাপ্রোজেক্ট বাস্তবায়নের সামর্থ্য বাংলাদেশ অর্জন করেছে। মানুষের গড় আয় বেড়েছে। আয়ু বেড়েছে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছে। এসব অর্জনকে যারা দেখতে চান না, তারা একদেশদর্শী। তাদের সঙ্গে বিতর্ক করা অর্থহীন।

তবে এটাও ঠিক যে আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। আরো অনেক সমস্যারই সমাধান করতে হবে। আমাদের দেশে এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষ আছেন। এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগবঞ্চিত। উচ্চশিক্ষা, কারগরি শিক্ষা, বিশেষায়িত শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। শিক্ষার মান নিয়ে আছে প্রশ্ন ও সমালোচনা।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সুশাসনের ক্ষেত্রে। আমরা কেন যেন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠী ও দলপ্রীতির বাইরে যেতে পারি না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো, যারা ক্ষমতার রাজনীতি করে, তারা ক্ষমতার বাইরে থাকতে যেসব কথা বলে ক্ষমতায় গিয়ে তার উল্টোটা চর্চা করে। এটা বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বেলায় যেমন সত্য, তেমনি অতীতে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির বেলায়ও সত্য। এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনটা আনবে কে? যারা খারাপটা চর্চা করছে, তারা ভালোটা আনবে মনে করে বসে থাকলে হবে না। এখন আওয়ামী লীগের শাসন অনেকের ভালো লাগছে না। ঠিক আছে, আওয়ামী লীগকে ভোটে পরাজিত করে তারচেয়ে ভালো একটি দলকে ক্ষমতায় আনার সুযোগ কি আমাদের দেশে আছে? আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি হতে পারে না। বিএনপি কেমন দল, তারা কি করতে পারে সে প্রমাণ অতীতে তারা দিয়েছে। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় জনকল্যাণের ব্রত নিয়ে একটি রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয় জরুরি, বলা যায় এটা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু সমাজের কোনো দিক থেকেই তেমন কোনো আয়োজন বা উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

এটা ঠিক, দেশের ঐতিহ্যবাহী পুরান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত এবং আস্থাভাজন। তিনি বিশ্বনেতার মর্যাদায় অভিষিক্ত। দেশ পরিচালনায় তিনি যে সাহস, বুদ্ধিমত্তা, সততা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছেন তা সব মহলেই স্বীকৃত। তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, গণহত্যায় প্রত্যক্ষ সহযোগী ও অংশগ্রহণকারী রাজাকার-আলবদরদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে যে সাহস এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতি নিষ্ঠা দেখিয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই।

অনেকের মনেই তাই প্রশ্ন, যে নেত্রী দেশি-বিদেশি বাধা-ষড়যন্ত্র পায়ে দলে অসাধ্য সাধন করে এগিয়ে যাচ্ছেন, দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তিনি কেন জনগণের আরো বেশি আস্থা অর্জনের জন্য দলীয় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছেন না?  তিনি কেন সরকারের সাফল্যকে ম্লান করতে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছে, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করছে বা অন্যভাবে অর্থ-সম্পদ লোপাট করছে, বিদেশে পাচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছেন না?

আমাদের দেশের মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো, সরকারের বিরুদ্ধে থাকা। আমাদের দেশে রাজনীতি মানেই বিরোধিতা, মানি না, মানবো না। এখানে ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা বলবান করতে হলে সরকারকে ত্রুটিমুক্ত থাকতে হবে। সরকারের ইমেজ ক্লিন না হলে বিরোধিতার রাজনীতি দুর্বল হবে না। বাংলাদেশে ক্লিন ইমেজের সরকার গঠনে একমাত্র শেখ হাসিনাই পারেন যোগ্য নেতৃত্ব দিতে। কারণ একমাত্র তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তাকে কেনা যায় না এবং তার কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই’। তিনি রাজনীতি করেন, দেশের মানুষকে কিছু দেওয়ার জন্য।

আমরা বিজয়ের ৫০ বছর পালনের মুহূর্তে স্বাধীনতার মূল চেতনায় উজ্জীবিত  হতে চাই।

একটি ধর্মনিরপেক্ষ, ন্যায়ানুগ, সাম্যময় মুক্ত দেশ চাই। একাত্তরে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এক পাকিস্তান ভেঙে দুই পাকিস্তান বানানোর জন্য নয়। পাকিস্তানের ২২ পরিবারের জায়গায় বাংলাদেশে ২২শ পরিবারের হাতে দেশের সব সম্পদ কুক্ষিগত হবে-এটাও আমাদের প্রত্যাশিত ছিল না। আজ বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন তার মোকাবিলায় কেবল আওয়ামী লীগের কাছে চাওয়ার তালিকা না বাড়িয়ে আমরা আমাদের যার যার অবস্থানে থেকে কি কোনো ভূমিকা পালন করতে পারি না? হেফাজত বা অন্য শক্তিগুলো যদি পশ্চাৎপদ ধারায় জনমত গঠন করতে পারে তাহলে যারা নিজেদের আধুনিক, গ্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক বলে দাবি করেন তারা কেন এই চিন্তাচেতনায় মানুষকে বোঝাতে পারেন না, সংগঠিত ও সমবেত করতে পারেন না? মানুষ নিশ্চয়ই বৈষম্য ও অন্যায্য ব্যবস্থায় বাস করতে চান না!                               লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা  ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here